Skip to content

গুনাহ ও তওবা: তওবা কত প্রকার ও কি কি? তওবা করার নিয়ম, তওবা করার উপায়, আমি তওবা করতে চাই কিন্তু তওবা কিভাবে করতে হয়? তওবা কেন করতে হবে? তওবার উপকারিতা? তওবার গুরুত্ব ও ফজিলত? তওবা ও গুনাহ মাফ সম্পর্কে 11 টি হাদীস

গুনাহ ও তওবা : তওবা কত প্রকার ও কি কি? তওবা করার নিয়ম, তওবা করার উপায়, আমি তওবা করতে চাই কিন্তু তওবা কিভাবে করতে হয়? তওবা কেন করতে হবে? তওবার উপকারিতা? তওবার গুরুত্ব ও ফজিলত? তওবা ও গুনাহ মাফ সম্পর্কে 11 টি হাদীস

আলোচনার বিষয় গুনাহ ও তওবাঃ

Table of contents
  • তওবা কি? তওবা কাকে বলে?
  • তওবা কত প্রকার ও কি কি?
  • তওবা কিভাবে করতে হয়? তওবা করার নিয়ম কি? তওবা করার উপায় কি? আমি তওবা করতে চাই কিন্তু তওবা কিভাবে করতে হয়? তওবা করার শর্ত সমূহ কি?
  • তওবা কেন করতে হবে? তওবার উপকারিতা? তওবার গুরুত্ব ও ফজিলত?
  • তওবা ও গুনাহ মাফ সম্পর্কে 11 টি হাদীস:

তওবা কি? তওবা কাকে বলে?

আলেমগণ বলেন, সকল প্রকার পাপ, অপরাধ থেকে তাওবা করা ওয়াজিব তথা অবশ্য করণীয়।

তওবা শব্দের আভিধানিক অর্থ – ফিরে আসা।

পরিভাষায় তওবা হলো: যে সকল কথা ও কাজ মানুষকে আল্লাহর নৈকট্য থেকে দূরে সরিয়ে দেয় তা থেকে ফিরে এসে ঐ সকল কথা ও কাজে লেগে যাওয়া, যা দিয়ে আল্লাহর নৈকট্য লাভ করা যায় ও তাঁর অসন্তুষ্টি থেকে বেঁচে থাকা যায়।

এক কথায় পাপ-কর্ম থেকে ফিরে এসে সৎকাজে প্রবৃত্ত হওয়া।

তওবা কত প্রকার ও কি কি?

পাপ বা অপরাধ দু ধরনের হয়ে থাকে।

এক. যে সকল পাপ শুধুমাত্র আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের হক বা অধিকার  সম্পর্কিত। যেমন শিরক করা, নামাজ আদায় না করা, মদ্যপান করা, সুদের লেনদেন করা ইত্যাদি।

দুই. যে সকল পাপ বা অপরাধ মানুষের অধিকার সম্পর্কিত। যে পাপ করলে কোন না কোন মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। যেমন, জুলুম-অত্যাচার, চুরি-ডাকাতি, ঘুষ খাওয়া, অন্যায়ভাবে সম্পদ আত্নসাৎ ইত্যাদি।

প্রথম প্রকার পাপ থেকে আল্লাহর কাছে তাওবা ও ক্ষমা প্রার্থনা করার সাথে তিনটি শর্তের উপস্থিতি জরুরী।

তওবা কিভাবে করতে হয়? তওবা করার নিয়ম কি? তওবা করার উপায় কি? তওবা করার শর্ত সমূহ কি?

প্রথম প্রকার পাপ থেকে তাওবা করার শর্ত হলো মোট তিনটি:

(১) পাপ কাজটি পরিহার করা।

(২) কৃত পাপটিতে লিপ্ত হওয়ার কারণে আন-রিকভাবে অনুতপ্ত হওয়া।

(৩) ভবিষ্যতে আর এ পাপ করব না বলে দৃঢ় সংকল্প গ্রহণ করা।

দ্বিতীয় প্রকার পাপ থেকে তাওবা করার শর্ত হলো মোট চারটি:

(১) পাপ কাজটি পরিহার করা।

(২) কৃত পাপটিতে লিপ্ত হওয়ার কারণে আন-রিকভাবে অনুতপ্ত হওয়া।

(৩) ভবিষ্যতে আর এ পাপ করব না বলে দৃঢ় সংকল্প গ্রহণ করা।

(৪) পাপের কারণে যে মানুষটির অধিকার ক্ষুন্ন করা হয়েছে বা যে লোকটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তার পাওনা পরিশোধ করা বা যথাযথ ক্ষতিপুরণ দিয়ে তার সাথে মিটমাট করে নেয়া অথবা তার কাছে ক্ষমা চেয়ে দাবী ছাড়িয়ে নেয়া।

মানুষের কর্তব্য হলো, সে সকল প্রকার পাপ থেকে তাওবা করবে, যা সে করেছে। যদি সে এক ধরনের পাপ থেকে তাওবা করে, অন্য ধরনের পাপ থেকে তাওবা না করে তাহলোেও সে পাপটি থেকে তাওবা হয়ে যাবে। তবে অন্যান্য পাপ থেকে তওবা তার দায়িত্বে থেকে যাবে।

একটি বা দুটো পাপ থেকে তাওবা করলে সকল পাপ থেকে তাওবা বলে গণ্য হয় না।

যেমন এক ব্যক্তি মিথ্যা কথা বলে, ব্যভিচার করে, মদ্যপান করে। সে যদি মিথ্যা কথা ও ব্যভিচার থেকে যথাযথভাবে তওবা করে তাহলোে এ দুটো পাপ থেকে তওবা হয়ে যাবে ঠিকই। কিন্তু মদ্যপানের পাপ থেকে তওবা হবে না। এর জন্য আলাদা তওবা করতে হবে। আর যদি তাওবার শর্তাবলী পালন করে সকল পাপ থেকে এক সাথে তাওবা করে তাহলোেও তা আদায় হয়ে যাবে।

তওবা করে আবার পাপে লিপ্ত হয়ে পড়লে আবারও তাওবা করতে হবে। তওবা রক্ষা করা যায় না বা বারবার তওবা ভেঙ্গে যায় এ অজুহাতে তওবা না করা শয়তানের একটি ধোকা বৈ নয়। অন্তর দিয়ে তওবা করে তার উপর অটল থাকতে আল্লাহ তাআলার কাছে তাওফীক কামনা করা যেতে পারে। এটা তাওবার উপর অটল থাকতে সহায়তা করে।

তওবা কেন করতে হবে? তওবার উপকারিতা? তওবার গুরুত্ব ও ফজিলত?

কুরআন, হাদীস ও উম্মাতের ঐক্যমতে প্রমাণিত হয়েছে যে, পাপ থেকে তাওবা করা ওয়াজিব।

আল্লাহ তাআলা বলেন:

وَتُوبُوا إِلَى اللَّهِ جَمِيعًا أَيُّهَا الْمُؤْمِنُونَ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ (سورة النور: 31)

হে ঈমানদারগন! তোমরা সকলে তোমরা সকলে আল্লাহর কাছে তওবা কর, যাতে তোমরা সফলকাম হতে পারো।

(সূরা আন-নূর: ৩১)

তিনি আরো বলেন:

وَأَنِ اسْتَغْفِرُوا رَبَّكُمْ ثُمَّ تُوبُوا إِلَيْه

আর তোমরা নিজেদের প্রতিপালকের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা কর, অতঃপর তাওবা কর।

(সূরা হুদ: ৩)

তিনি আরো বলেন:

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آَمَنُوا تُوبُوا إِلَى اللَّهِ تَوْبَةً نَصُوحًا.

হে ঈমানদারগন! তোমরা আল্লাহর নিকট তাওবা কর, বিশুদ্ধ তাওবা।

(সূরা আত-তাহরীম: ৮)

এ আয়াতসমূহ থেকে আমরা যা শিখতে পারি:

১- আল্লাহ রাব্বুল আলামীন সকল ঈমানদারকে তাওবা করার নির্দেশ দিয়েছেন।

২- তাওবা দুনিয়া ও আখেরাতের সাফল্য লাভের মাধ্যম।

৩- তাওবার আগে ইসে-গফার বা ক্ষমা প্রার্থনা করতে হবে। তারপর তাওবা। ভবিষ্যতে এমন পাপ করব না বলে তাওবা করলাম কিন’ অতীতে যা করেছি এ সম্পর্কে ক্ষমা প্রার্থনা করলাম না। মনে মনে ভাবলাম যা করেছি তা করার দরকার ছিল, ক্ষমা চাওয়ার প্রয়োজন কি? তাহলোে তাওবা কবুল হবে না। যেমন দ্বিতীয় আয়াতটিতে আমরা দেখি, আল্লাহ তাআলা বলেনঃ আর তোমরা নিজেদের প্রতিপালকের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা কর, তারপর তাওবা কর।

৪- তওবা ও ইসে-গফার হলো পার্থিব জীবনে সুখ শানি- লাভের একটি মাধ্যম যেমন আল্লাহ তাআলা বলেন:

وَأَنِ اسْتَغْفِرُوا رَبَّكُمْ ثُمَّ تُوبُوا إِلَيْهِ يُمَتِّعْكُمْ مَتَاعًا حَسَنًا إِلَى أَجَلٍ مُسَمًّى

আর তোমরা নিজেদের প্রতিপালকের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা কর তৎপর তাওবা কর, তিনি তোমাদের নির্দিষ্ট কাল পর্যন- সুখ-সম্ভোগ দান করবেন। (সূরা হুদ: ৩)

নূহ আলাইহিস সালাম তার সমপ্রদায়কে  বলেছিলেন:

فَقُلْتُ اسْتَغْفِرُوا رَبَّكُمْ إِنَّهُ كَانَ غَفَّارًا ﴾ يُرْسِلِ السَّمَاءَ عَلَيْكُمْ مِدْرَارًا ﴾ وَيُمْدِدْكُمْ بِأَمْوَالٍ وَبَنِينَ وَيَجْعَلْ لَكُمْ جَنَّاتٍ وَيَجْعَلْ لَكُمْ أَنْهَارًا ﴾ (سورة نوح: 10-12)

আমি বললাম, তোমাদের প্রতিপালকের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা কর, তিনি তো ক্ষমাশীল। তিনি তোমাদের জন্য প্রচুর বৃষ্টিপাত বর্ষণ করবেন। তিনি তোমাদের সমৃদ্ধি দান করবেন ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্তুতিতে এবং তোমাদের জন্য সৃষ্টি করবেন উদ্যান ও প্রবাহিত করবেন নদী-নালা। (সূরা নূহ: ১০-১২)

৫- আল্লাহ তাআলা বিশুদ্ধ তাওবা করতে আদেশ করেছেন। বিশুদ্ধ তাওবা হলো যে তাওবা করা হয় সকল শর্তাবলী পালন করে। শর্তসমূহ ইতিপূর্বে আলোচিত হয়েছে।

তওবা ও গুনাহ মাফ সম্পর্কে হাদীসসমূহ:

তওবা ও গুনাহ মাফ সম্পর্কে হাদীস (১)

আবু হুরাইরা রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূলুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম -কে বলতে শুনেছি: আমি দিনের মধ্যে সত্তর বারেরও বেশী আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা (ইস্তেগফার) করি ও তাওবা করি। (বর্ণনায়: বুখারী)

তওবা ও গুনাহ মাফ সম্পর্কে হাদীস (২)

আগার ইবনে ইয়াসার আল-মুযানী রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম  বলেছেন: হে মানব সকল তোমরা আল্লাহর কাছে তাওবা ও ক্ষমা প্রার্থনা কর। আর আমি দিনে একশত বারের বেশী তাওবা করে থাকি। (বর্ণনায়: মুসলিম)

১- রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম  ছিলেন মাসূম অর্থ্যাৎ সকল পাপ থেকে মুক্ত। তারপরও তিনি সর্বদা ইসে-গফার ও তাওবা করেছেন। কারণ, তিনি উম্মাতকে ইসে-গফার ও তাওবার গুরুত্ব অনুধাবন করাতে চেয়েছেন। পাপ না থাকলেও তাওবা ইসে-গফার করা যায়, এবং এর মাধম্যে আল্লাহ তাআলার কাছে মর্যাদা বৃদ্ধি হয়, এটা উম্মাতকে শিখিয়েছেন।

২- ইস্তেগফার ও তওবা হলো ইবাদত। পাপ না করলে তা করা যাবে না এমন কোন নিয়ম নেই। কেহ যদি তার নজরে কোন পাপ নাও দেখে তবুও সে যেন ইস্তেগফার ও তাওবা পরিহার না করে। হতে পারে তার দ্বারা অজান্তে কোন পাপ সংঘটিত হয়ে গেছে বা কোন পাপ করে সে ভুলে গেছে।

৩- হাদীসে একশ সংখ্যাটি আধিক্য বুঝানোর জন্য ব্যবহার করা হয়েছে। নির্দিষ্ট সংখ্যা বুঝাতে ব্যবহার করা হয়নি। তাইতো দেখা যায় কোন হাদীসে সত্তর বারের কথা এসেছে, আবার কোন হাদীসে একশ বারের কথা এসেছে।

৪- ইস্তেগফার ও তাওবা আমলটি সর্বদা অব্যাহত রাখা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সুন্নত।

তওবা ও গুনাহ মাফ সম্পর্কে হাদীস (৩)

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর খাদেম আবু হামযা আনাস ইবেন মালেক রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন:

তোমাদের তাওবা করায় আল্লাহ তাআলা ঐ ব্যক্তির চেয়েও বেশী আনন্দিত হন যে ব্যক্তি তার উট জনমানবহীন প্রান্ত-রে হারিয়ে যাওয়ার পর আবার তা ফিরে পেয়েছে।

বর্ণনায়ঃ বুখারী ও মুসলিম

তবে সহীহ মুসলিমের অন্য এক বর্ণনায় এসেছে যে, আল্লাহ তার বান্দার তাওবায় ঐ ব্যক্তির চেয়েও অধিক আনন্দিত হন, যার উট খাদ্য ও পানীয়সহ জনমানবহীন মরুভূমিতে হারিয়ে গেছে। এ কারণে সে জীবন থেকে নিরাশ হয়ে কোন এক গাছের নীচে শুয়ে পড়ল। এমন নৈরাশ্য জনক অবস্থায় হঠাৎ তার কাছে উটটিকে দাঁড়ানো অবস্থায় দেখতে পেয়ে এর লাগাম ধরে আনন্দে আত্নহারা হয়ে বলে ফেলল, হে আল্লাহ! তুমি আবার বান্দা, আমি তোমার প্রভূ। অর্থ্যাত সে এ ভুলটি বলেছে আনন্দের আধিক্যে।

১- আল্লাহ তাআলা কত বড় মেহেরবান যে, আল্লাহ তায়ালা বান্দার তাওবা কবুল করে থাকেন ও তাওবাকারীকে ভালোবাসেন। যেমন তিনি নিজেই বলেছেন:

নিশ্চয়ই আল্লাহ তাওবাকারীদের ভালোবাসেন এবং ভালোবাসেন পবিত্রতা অর্জনকারীদের। (সূরা আল-বাকারা, আয়াত- ২২২)

২- রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার উম্মাতকে তাওবা করতে উৎসাহ দিয়েছেন।

৩- অনিচ্ছাকৃত পাপ বা ভুলের শাস্তি আল্লাহ দেবেন না। যেমন উল্লেখিত ব্যক্তি অনিচ্ছায় আল্লাহকে বান্দা বলে ফেলেছে।

৪- ওয়াজ-নসীহতে ও শিক্ষা দানে বিভিন্ন উদাহরণ, উপমা  দেয়া দোষের কিছু নয়। বরং উত্তম। যেমন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এ হাদীসে এক ব্যক্তির উপমা দিয়েছেন।

তওবা ও গুনাহ মাফ সম্পর্কে হাদীস (৪)

আবু মূসা আব্দুল্লাহ বিন কায়েস আশআরী রা. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম  থেকে বর্ণনা করেন যে তিনি বলেন: আল্লাহ তাআলা রাত্রি বেলা তার ক্ষমার হাত প্রসারিত করেন, যেন দিনের বেলা যারা পাপ করেছে তারা তাওবা করে নেয়। দিনের বেলাও তিনি ক্ষমার হাত প্রসারিত করেন যাতে রাতের পাপীরা তাওবা করে নেয়। এমনিভাবে (তার তাওবার দরজা) উম্মুক্ত থাকবে যতক্ষণ না সূর্য পশ্চিম দিক দিয়ে উদিত হয়। (বর্ণনায়: মুসলিম )

১- আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের রহমত সকল সময় ব্যাপী। কোন সময়ের সাথে খাছ নয়। যদিও কোন কোন সময়ের আলাদা ফজিলত রয়েছে।

২- দেরি না করে তাড়াতাড়ি তাওবা করার জন্য উৎসাহিত করা হয়েছে।

৩- তাওবার দ্বার সর্বদা উম্মুক্ত। যে কোন সময় তাওবা করা যেতে পারে। তবে মৃত্যু বা কেয়ামতের লক্ষণ প্রকাশ পেলে তাওবার দ্বার বন্ধ হয়ে যায়।

তওবা ও গুনাহ মাফ সম্পর্কে হাদীস (৫)

আবু হুরাইরা রা. থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: যে ব্যক্তি পশ্চিম দিক দিয়ে সূর্য উদয়ের পূর্বে (কেয়ামত শুরুর পূর্বে) তাওবা করবে আল্লাহ তাআলা তার তাওবা গ্রহণ করবেন। (বর্ণনায়: মুসলিম)

১- চূড়ান্ত মুহুর্তের অপেক্ষা না করে এক্ষুনি তওবা করা কর্তব্য।

২- তওবার জন্য উৎসাহিত করা হয়েছে এ হাদীসে।

৩- কেয়ামতের একটি বড় আলামত হলো সূর্য পশ্চিম দিক দিয়ে উদিত হওয়া।

৪- তওবা কবুলের সময়টা ব্যাপক বিস্তৃত। এমনকি তা কেয়ামতের পূর্বক্ষণে হলোেও তওবা গ্রহণ করা হবে।

তওবা ও গুনাহ মাফ সম্পর্কে হাদীস (৬)

আব্দুল্লাহ বিন উমার রা. থেকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম  থেকে বর্ণনা করেন যে, তিনি বলেছেন: অবশ্যই আল্লাহ তাআলা তার বান্দার তাওবা কবুল করেন গড়গড় করার (মৃত্যুর লক্ষণ প্রকাশের) পূর্ব পর্যন্ত। বর্ণনায়: তিরমিজী

১- তাওবার একটি শর্ত হলো, তাওবা করতে হবে মৃত্যুর আলামত প্রকাশের পূর্বে। মৃত্যুর আলামত প্রকাশ পেতে শুরু করলে তাওবা কবুল হবে না। যেমন আল্লাহ তাআলা বলেন: তাদের জন্য তাওবা নেই, যারা ঐ পর্যন্ত পাপ করতে থাকে, যখন তাদের কারো নিকট মৃত্যু উপস্থিত হয় তখন বলে নিশ্চয়ই আমি এখন তওবা করলাম। সূরা আন-নিসা, আয়াত- ১৮

২- সুস্থ জীবন তওবার উপযুক্ত সময়। জীবন থেকে নিরাশ হওয়ার পর তওবার উপযুক্ত সময় আর থাকে না। এমনিভাবে পাপ করার সামর্থ থাকাকালীন সময়টা হলো তওবার উপযুক্ত সময়। পাপ করার ক্ষমতা লোপ পেয়ে গেলে তওবা করা যথোপযুক্ত নয়। তবুও তওবা করা উচিত।

তওবা ও গুনাহ মাফ সম্পর্কে হাদীস (৭)

যির ইবনে হুবাইশ বলেনঃ মোজার উপর মাসেহ সম্পর্কে জানার জন্য আমি সাফওয়ান ইবনে আসসাল রা. এর কাছে আসলাম। তিনি জিজ্ঞেস করলেন হে যির! তুমি কি উদ্দেশ্যে এসেছ? আমি বললাম জ্ঞান অর্জনের জন্য এসেছি। তিনি বললেন, ফেরেশ্‌তাগণ জ্ঞান অর্জনকারীর জ্ঞান অন্বেষণে সন্তুষ্ট হয়ে তার সম্মানে তাদের ডানা বিছিয়ে দেয়। আমি বললাম, মল-মুত্র ত্যাগের পর মোজার উপর মাসেহ করা সম্পর্কে আমার মনে খটকা লাগে। আপনিতো নবী কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর একজন সাহাবী। তাই এ ব্যাপারে আমি আপনাকে জিজ্ঞেস করতে এসেছি। আপনি কি এ ব্যাপারে তাঁর থেকে কিছু শুনেছেন? তিনি বললেন, হ্যাঁ, যখন আমরা সফরে থাকতাম তখন তিন দিন ও তিন রাত পর্যন্ত তিনি মল-মুত্র ত্যাগের পর, নিদ্রা থেকে জাগার পর মোজা না খোলার জন্য বলেছেন। তবে গোসল ফরজ হলোে অন্য কথা। আমি জিজ্ঞেস করলাম, ভালোবাসা সম্পর্কে তাকে কিছু বলতে শুনেছেন? তিনি বললেন, হ্যাঁ, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম  এর সাথে কোন এক সফরে ছিলাম। হঠাৎ একজন বেদুইন এসে উঁচুস্বরে ডাক দিয়ে বলল, হে মুহাম্মাদ!। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার মত উচ্চস্বরে ডাক দিয়ে বললেন: এগিয়ে এসো! আমি তাকে বললাম, তোমার জন্য দুঃখ হয়, তোমার আওয়াজ নীচু কর। তুমিতো নবীর দরবারে এসেছ। তার দরবারে আওয়াজ বড় করতে নিষেধ করা হয়েছে। বেদুইন লোকটি বলল, আমি আমার আওয়ায ছোট করতে পারছি না। কোন ব্যক্তি যখন কোন দলকে ভালোবাসে অথচ এখনও তাদের সাথে সাক্ষাত করতে পারেনি? (সে অস্থির হতেই পারে, এতে দোষের কি?)

তার কথা শুনে নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম  বললেনঃ যে যাকে ভালোবাসে কেয়ামতের দিন সে তার সাথে থাকবে। এভাবে তিনি কথা বলতে বলতে পশ্চিম দিকের একটি দরজার কথা বললেন। যার প্রস্থের দূরত্ব অতিক্রমে পায়ে হেটে গেলে বা যানবাহনে গেলে চল্লিশ বা সত্তর বছর সময় লাগবে। হাদীস বর্ণনাকারী সুফিয়ান এ কথার ব্যাখ্যায় বলেন, যে দিন আল্লাহ আকাশ মণ্ডলী ও পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন, সেদিন থেকে শাম (সিরিয়া, লেবানন, ফিলিস্তিন, জর্দান) অঞ্চলের দিক দিয়ে এ দরজা তাওবার জন্য উম্মুক্ত রেখেছেন। পশ্চিম দিক দিয়ে সুর্যোদয় না হওয়া পর্যন- এ দরজা বন্ধ করা হবে না।

বর্ণনায়: তিরমিজী।

১- ধর্মীয় জ্ঞান অন্বেষণ করার জন্য উৎসাহিত করেছে এ হাদীস। যারা ধর্মীয় জ্ঞান অন্বেষনে লিপ্ত থাকে, তাদের ফজিলত উল্যেখ করা হয়েছে। আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যা নিয়ে এসেছেন তা হলো ধর্মীয় জ্ঞান। যারা এ জ্ঞান অন্বেষনে লিপ্ত ফেরেশ্‌তাগন তাদের সম্মান করে থাকেন।

২- মোজার উপর মাসেহ করার সুন্নাত প্রমাণিত। কিছু শর্ত স্বাপেক্ষে অজু করার সময় মোজা না খুলে মোজার উপর মাসেহ করা যায়। পা ধৌত করার প্রয়োজন হয় না। মোজার উপর মাসেহ করা শর্তসমূহ হলো:

(ক) অজু থাকা অবস্থায় মোজা পরিধান করতে হবে।

(খ) মোজা পায়ের গোড়ালী ঢেকে রাখে এমন হতে হবে।

(গ) পায়ে পানি প্রবেশ প্রতিরোধ করে এমন মোজা হতে হবে।

(ঘ) দীর্ঘ সময় হাটা-চলা করলেও মোজা ফেটে যায় না বা ছিড়ে যায় না, এমন ধরণের মোজা হতে হবে।

(ঙ) অজুর সময়ে মোজার উপর মসেহ করার বিধান সীমিত। ফরজ গোসলে নয়।

(চ) মুকীম অর্থাৎ নিজ বাড়ীতে অবস্থান রত ব্যক্তি পবিত্র অবস্থায় মোজা পরিধানের পর থেকে একদিন ও এক রাত সময় পর্যন্ত মোজার উপর মাসেহ করার সুযোগ লাভ করবেন। আর মুসাফির তিন দিন তিন রাত মাসেহ করার সুযোগ পাবেন।

৩- আলেম ও বিদ্বানদের সম্মান করা। তাদের মজলিসে উচ্চস্বরে কথা না বলা।

৪- অজ্ঞ ব্যক্তিকে শিক্ষাদানে বিনম্র পন্থা অবলম্বন করা ও কঠোরতা পরিহার করা।

৫- আলেম-উলামাদের ভালোবাসা ও তাদের সম্মান করা এবং তাদের সহচর্য লাভ করার চেষ্টা করা।

৬- ভালোবাসার দাবী হলো, যাকে ভালোবাসবে তার আদর্শের অনুসরণ করবে।

৭- এমন লোকদের ভালোবাসা উচিত যার সাথে হাশর হলোে সে ভাগ্যবান বলে বিবেচিত হবে। এমন কাউকে ভালোবাসা উচিত নয় যে আখেরাতে হতভাগা বলে বিবেচিত হবে।

৮- ইসলামের কোন বিষয়ে মনে সংশয় সৃষ্টি হলোে বা খটকা লাগলে তা আলেমদের কাছে যেয়ে বা প্রশ্ন করে নিরসন করা দরকার। যেমন সফওয়ান বলেছেন আমার মনে খটকা লাগে। তিনি তার সংশয় দূর করতে দীর্ঘ সফর করেছেন।

৯- তাওবার দরজা সর্বদা খোলা আছে। এ বিষয়টি উল্লেখ করার কারণে হাদীসটি তাওবা অধ্যায়ে স্থান পেয়েছে।

তওবা ও গুনাহ মাফ সম্পর্কে হাদীস (৮)

আবু সাঈদ সাদ ইবনে মালেক ইবনু সিনান আল-খুদরী রা. থেকে বর্ণিত, নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: তোমাদের পূর্বের এক যুগে এক ব্যক্তি নিরানব্বই জন মানুষকে হত্যা করল। এরপর সে সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ আলেমের অবস্থান সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করল। তাকে এক পাদ্রীকে দেখিয়ে দেয়া হলো। সে তার কাছে গিয়ে বলল, সে নিরানব্বই জন মানুষকে খুন করেছে তার তাওবার কোন ব্য আছে কি না? পাদ্রী উত্তর দিল, নেই। এতে লোকটি ক্ষিপ্ত হয়ে পাদ্রীকে হত্যা করে একশত সংখ্যা পুরণ করল। এরপর আবার সে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ আলেম সম্পর্কে জানতে চাইল। তাকে এক আলেমেকে দেখিয়ে দেয়া হলো। সে আলেমের কাছে যেয়ে জিজ্ঞাসা করল, সে একশত মানুষকে খুন করেছে, তার তাওবা করার কোন সুযোগ আছে কিনা? আলেম বললেন, হ্যাঁ, তাওবার সুযোগ আছে। এ ব্যক্তি আর তাওবার মধ্যে কি বাধা থাকতে পারে? তুমি অমুক স্থানে চলে যাও। সেখানে কিছু মানুষ আল্লাহ তাআলার ইবাদত-বন্দেগী করছে। তুমি তাদের সাথে আল্লাহর ইবাদত-বন্দেগী করতে থাকো। আর তোমার দেশে ফিরে যেও না। সেটা খারাপ স্থান। লোকটি নির্দেশিত স্থানের দিকে পথ চলতে শুরু করল। যখন অর্ধেক পথ অতিক্রম করল তখন তার মৃত্যুর সময় এসে গেল। তার মৃত্যু নিয়ে রহমতের ফেরেশ্‌তা ও শাস্তির ফেরেশ্‌তাদের মধ্যে ঝগড়া শুরু হলো। রহমতের ফেরেশ্‌তাগন বললেন, এ লোকটি আন-রিকভাবে তাওবা করে আল্লাহর দিকে ফিরে এসেছে। আর শাসি-র ফেরেশ্‌তাগন বললেন, লোকটি কখনো কোন ভাল কাজ করেনি। তখন এক ফেরেশ্‌তা মানুষের আকৃতিতে তাদের কাছে এল। উভয় দল তাকে ফয়সালাকারী হিসাবে মেনে নিল। সে বলল, তোমরা উভয় দিকে স্থানের দূরত্ব মেপে দেখ। যে দুরত্বটি কম হবে তাকে সে দিকের লোক বলে ধরা হবে। দূরত্ব পরিমাপের পর যে দিকের উদ্দেশ্যে সে এসেছিল তাকে সে দিকটির নিকটবর্তী পাওয়া গেল। এ কারণে রহমতের ফেরেশ্‌তাগণই তার জান কবজ করল। (বর্ণনায়: বুখারী ও মুসলিম)

বুখারীর অন্য এক বর্ণনায় এসেছে, সে ভাল মানুষদের স্থানের দিকে মাত্র অর্ধহাত বেশী পথ অতিক্রম করেছিল, তাই তাকে তাদের অন্তর্ভূক্ত বলে ধরা হয়েছে। বুখারীর আরেকটি বর্ণনায় এসেছে, আল্লাহ যমীনকে নির্দেশ দিলেন, যেন ভাল দিকের অংশটা নিকটতর করে দেয়। আর খারাপ দিকের অংশটার দুরত্ব বাড়িয়ে দেয়। পরে সে বলল, এখন তোমরা উভয় দুরত্ব পরিমাপ করো। দেখা গেল সে মাত্র অর্ধ হাত পথ বেশী অতিক্রম করেছে। এ কারণে আল্লাহ তাআলা তাকে ক্ষমা করে দিলেন।

১- ওয়াজ, বক্তৃতা ও শিক্ষা প্রদানে বাস-ব উদাহরণ পেশ করার অনুপম দৃষ্টান- রেখেছেন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম।

২- যার ইবাদত কম কিন্তু ইলম বেশী, সে শ্রেষ্ঠ ঐ ব্যক্তির চেয়ে, যার ইবাদত বেশী ইলম কম। যেমন এ হাদীসে দেখা গেল যে ব্যক্তি ফতোয়া দিল যে তোমার তাওবা নেই সে আলেম ছিল না, ছিল একজন ভাল আবেদ। তার কথা সঠিক ছিল না। আর যে তাওবার সুযোগ আছে বলে জানাল, সে ছিল একজন ভাল আলেম। তার কথাই সঠিক প্রমাণিত হলো।

৩- বিভিন্ন ওয়াজ, নসীহত, বক্তৃতা, লেখনীতে পূর্ববর্তী জাতিদের ঘটনা তুলে ধরা যেতে পারে। তবে তা যেন কুরআন-সুন্নাহ বা ইসলামী কোন আকীদার পরিপনি’ না হয়।

৪- গুনাহ বা পাপ যত মারাত্নকই হোকনা কেন, তা থেকে তাওবা করা সম্ভব।

৫- দাঈ অর্থাত ইসলামের দাওয়াত-কর্মীদের এমন কথা বার্তা বলা দরকার যাতে মানুষ আশান্বিত হয়। মানুষ নিরাশ হয়ে যায়, এমন ধরনের কথা বলা ঠিক নয়।

৬-  সর্বদা ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করা আর নৈতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি পরিহার করা আলেম ও দায়ীদের একটি বড় গুণ।

৭- অসৎ ব্যক্তি ও অসুস্থ সমাজের সঙ্গ বর্জন করা। এবং সৎ ব্যক্তি ও সৎ সমাজের সঙ্গে থাকার চেষ্টা করা কর্তব্য।

৮- ফেরেশতাগন বিভিন্ন আকৃতি ধারণ করতে পারেন।

৯- যে আল্লাহর পথে চলার চেষ্টা করে আল্লাহর রহমত তার দিকে এগিয়ে আসে। তাকে সঠিক পথ প্রদর্শন করেন এবং পথ চলা সহজ করে দেন।

১০- আল্লাহ তাআলা তার বান্দাদের ক্ষমা করে দেয়ার দিকটা  প্রাধান্য দিয়ে থাকেন।

১১- আল্লাহ তাআলা পরাক্রমশালী হওয়া সত্বেও আদল ও ইনসাফ পছন্দ করেন। তাই দু দল ফেরেশতার বিতর্ক একটি ন্যায়ানুগ পন্থায় ফয়সালা করার জন্য অন্য ফেরেশতা পাঠালেন।

১২- হাদীসটি দিয়ে বুঝে আসে, যে মানুষ হত্যা করার অপরাধে অপরাধী আল্লাহ তাকে ক্ষমা করে দিতে পারেন যদি সে তাওবা করে। অথচ অন্য অনেক সহীহ হাদীস স্পষ্টভাবে বলে দিচ্ছে যে, আল্লাহ মানুষের অধিকার হরণকারীকে ক্ষমা করেন না। অতএব যে কাউকে হত্যা করল সে তো অন্য মানুষের বেচে থাকার অধিকার হরণ করে নিল। আল্লাহ তাকে কিভাবে ক্ষমা করবেন?

এর উত্তর হলো: যে ব্যক্তি কোন মানুষকে হত্যা করল সে তিন জনের হক (অধিকার) ক্ষুন্ন করল। এক. আল্লাহর অধিকার বা হক। কারণ আল্লাহ মানুষ হত্যা করতে নিষেধ করেছেন। মানুষকে নিরাপত্তা দিতে আদেশ করেছেন। হত্যাকারী আল্লাহর নির্দেশ লংঘন করে সে তাঁর অধিকার ক্ষুন্ন করেছে। দুই. নিহত ব্যক্তির অধিকার। তাকে হত্যা করে হত্যাকারী তার বেঁচে থাকার অধিকার হরণ করেছে। তিন. নিহত ব্যক্তির আত্নীয়-স্বজন, পরিবার ও সন্তানদের অধিকার। হত্যাকারী ব্যক্তিকে হত্যা করে তার পরিবারের লোকজন থেকে ভরণ-পোষণ, ভালোবাসা-মুহব্বাত, আদর-স্নেহ পাবার অধিকার থেকে চিরতরে বঞ্চিত করেছে।

হত্যাকারী এ তিন ধরণের অধিকার হরণের অপরাধ করেছে। আল্লাহর কাছে তাওবা করলে আল্লাহ শুধু প্রথম অধিকার -যা তাঁর নিজের সাথে সংশ্লিষ্ট- নষ্ট করার অপরাধ ক্ষমা করবেন। দ্বিতীয় ও তৃতীয় অপরাধ ক্ষমা করবেন না। এ হাদীসে প্রথম ধরনের অপরাধ ক্ষমা করার কথা বলা হয়েছে। (শরহু রিয়াদিস সালেহীন মিন কালামে সাইয়েদিল মুরসালীন: মুহাম্মাদ বিন সালেহ আল-উসাইমীন রহ.)

তওবা ও গুনাহ মাফ সম্পর্কে হাদীস (৯)

আবু নুজাইদ ইমরান ইবনে হুসাইন আল-খুযাঈ রা. থেকে বর্ণিত, জুহাইনা গোত্রের এক মহিলা ব্যভিচারের কারণে গর্ভবতী হয়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর কাছে এসে বলল, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমি শাসি-যোগ্য অপরাধ করেছি, আমাকে এর জন্য শাস্তি প্রদান করুন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম  তার অভিভাবককে ডেকে বললেন, এর সাথে ভাল আচরণ করবে। যখন সে সন্তান প্রসব করবে তখন তাকে আমার কাছে নিয়ে আসবে। এ লোকটি তাই করল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে শাসি- প্রদানের আদেশ দিলেন। এরপর তার শরীরের কাপড় ভাল করে বেঁধে দেয়া হলো। অতঃপর পাথর মেরে তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হলো। এরপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার জন্য জানাযা নামাজ পড়লেন। উমার রা. বললেনঃ ইয়া রাসূলাল্লাহ! যে ব্যভিচার করেছে এমন নারীর জানাযা নামায আপনি পড়েছেন? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেনঃ সে এমন তাওবা করেছে যে, তা যদি সত্তর জন মদীনা বাসীর মধ্যে বন্টন করে দেয়া হত, তাহলোে তাদের মুক্তির জন্য এটা যথেষ্ঠ হয়ে যেত। যে মহিলা নিজের প্রাণকে মহা পরাক্রমশালী আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে স্বেচ্ছায় উৎসর্গ করে দেয়, তার এরূপ তাওবার চেয়ে শ্রেষ্ঠ কাজ তুমি পেয়েছ কি?  বর্ণনায়: মুসলিম

১- ঈমানদার ব্যক্তির চরিত্র হলো, যখন কোন পাপ করে তখন তা থেকে পবিত্র হতে চায়। অনুতাপ, অনুশোচনা, তাওবা ও শাস্তি গ্রহণের মাধ্যমে আল্লাহ তাআলার কাছে ক্ষমা ও রহমতের আশা করে।

২- শাস্তি প্রদানে নিরাপরাধ মানুষ যেন ক্ষতিগ্রস্ত না হয় সে দিকে খেয়াল রাখা। যেমন গর্ভে অবস্থিত বাচ্চার কারণে এ মহিলা সাহাবী রাদিয়াল্লাহু আনহার শাস্তি প্রদান বিলম্ব করা হয়েছে।

৩- পাপকে ঘৃণা করা উচিত। যে পাপ করেছে তাকে নয়। যেমন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম  এ মহিলার সাথে সদাচারণ করতে নির্দেশ দিয়েছেন।

৪- রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর দয়া ও করুনার দৃষ্টান্ত: তিনি গর্ভের বাচ্চার প্রতি দয়া দেখালেন, অপরাধী এ মহিলার সাথে ভাল ব্যবহার করার জন্য তার অভিভাবককে নির্দেশ দিলেন, তার শাস্তি কার্যকর করার পর তার জন্য দোআ করলেন, তার প্রশংসা করলেন।

৫- আল্লাহর আইন বাস-বায়নে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম  এর দৃঢ়তা। তিনি এ মহিলার প্রতি দয়াদ্র হলোেও তাকে শাসি- থেকে রেহাই দেয়ার ক্ষমতা রাখলেন না।

৬- যে আদালতের কাছে এসে পাপ বা অপরাধ স্বীকার করে, আদালত তাকে শাসি- দিতে বাধ্য। শাস্তি প্রদান ব্যতীত আদালতের আর কিছু করার থাকে না।

৭- মহিলা বিবাহিত থাকা সত্বেও ব্যভিচার করেছে বলেই তাকে প্রস্তর নিক্ষেপে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়েছে। অবিবাহিত ব্যভিচারীর শাস্তি হলো একশ বেত্রাঘাত। যেমন আল-কুরআনের সূরা আন-নূরের দ্বিতীয় আয়াতে উল্লেখ করা হয়েছে। মৃত্যুদণ্ড শুধু বিবাহিত ব্যভিচারের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা হয়।

৮- কেহ ব্যভিচার করে থাকলে তা থেকে তাওবা ও পবিত্রতা অর্জনের উদ্দেশ্যে যদি ব্যভিচারের কথা যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে স্বীকার করে, তবে তা নাজায়েয নয়। কিন্তু যদি পবিত্রতা অর্জনের উদ্দেশ্য ব্যতীত অন্য কোন উদ্দেশ্যে নিজের ব্যভিচারের কথা মানুষকে বলে দেয়, তবে তা আরেকটি অপরাধ। প্রথমত পাপ করার অপরাধ, দ্বিতীয়ত পাপকে প্রচার করার অপরাধ।

তওবা ও গুনাহ মাফ সম্পর্কে হাদীস (১০)

ইবনে আব্বাস ও আনাস ইবনে মালেক রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম  বলেছেন: যদি কোন মানব সন্তানের এক উপত্যকা ভরা সোনা থাকে, তাহলোে সে দুটো উপত্যকা (ভর্তি) সোনা কামনা করে। তার মুখ মাটি ব্যতীত আর কিছুতেই ভরে না। আর যে তাওবা করে আল্লাহ তার তাওবা কবুল করেন। (বর্ণনায়: বুখারী ও মুসলিম)

১- সকল মানুষই অর্থ, সম্পদ পেতে চায় ও এর প্রতি লোভী।

২- মানুষ স্বভাবগতভাবে কৃপণ। সে অর্থ সম্পদ শেষ হয়ে যাওয়ার ভয় করে। আর এ জন্য সে যত সম্পদের মালিক হোক না কেন, শুধু আরো চায়। যেমন আল্লাহ তাআলা বলেন:

বলঃ যদি তোমরা তোমার প্রতিপালকের দয়ার ভাণ্ডারের অধিকারী হতে তবুও তোমরা খরচ হয়ে যাবে এই আশংকায় ওটা ধরে রাখতে, মানুষ তো অতিশয় কৃপণ। (সূরা আল-ইসরা: ১০০)

৩- সম্পদ অর্জন করা ভাল, তবে সম্পদ অর্জনটা নেশায় পরিণত হওয়া বা জীবনের একমাত্র লক্ষ্য হওয়া মোটেই ভাল নয়।

৪- সম্পদের আধিক্য মানুষকে ধনী করে না। বরং তার অভাব বা চাহিদা বাড়িয়ে দেয়। মনের দিক দিয়ে যে ধনী, সে-ই প্রকৃত ধনী।

৫- ইসলামী অর্থনীতির একটি মৌলিক বিষয় এ হাদীসে ফুটে উঠেছে। তা হলো, যার সম্পদ যত বেশি তার অভাব বা চাহিদা তত বেশি।

৬- তাওবাকারীর তাওবা আল্লাহ তাআলা কবুল করেন। হাদীসের এ বিষয়টির সাথে আলোচ্য বিষয়ের শিরোনামের সম্পর্ক।

তওবা ও গুনাহ মাফ সম্পর্কে হাদীস (১১)

আবু হুরাইরা রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম  বলেছেনঃ আল্লাহ ছুবহানাহু ওয়া তাআলা এমন দু ব্যক্তির ব্যাপারে হাসবেন, যারা একে অপরকে হত্যা করবে এবং উভয়ই জান্নাতে প্রবেশ করবে। একজন আল্লাহর পথে লড়াই করে শহীদ হবে। এরপর আল্লাহ (সেই শহীদের) হত্যাকারীর তাওবা কবুল করবেন এবং সে ইসলাম গ্রহণ করে (যুদ্ধে অংশ নিয়ে) শহীদ হয়ে যাবে। (বর্ণনায়: বুখারী ও মুসলিম)

১- অপরাধ ও পাপ যত মারাত্নকই হোক, অবশ্যই তা থেকে তাওবা করতে হবে।

২- আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হওয়া যাবে না। যত অপরাধ বা পাপ করে না কেন, যত বিপদ-মুসীবতে আক্রান্ত হয় ঈমানদার সর্বদা আল্লাহর রহমত ও ক্ষমার প্রত্যাশা করে।

৩- ইসলাম গ্রহণের কারণে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ইসলাম গ্রহণের পূর্বে কাফের থাকা কালীন সময়ের সকল পাপ, অন্যায় ও অপরাধ ক্ষমা করে দেন।

৪- আল্লাহর পথে জিহাদ করে শহীদ হওয়ার মর্যাদা এ হাদীসটি দিয়েও প্রমাণিত। অবশ্যই শাহাদাতের পুরস্কার হলো জান্নাত।

পোষ্টটি লিখতে নিম্নক্তো বই/লেখকের লিখনী থেকে সাহায্য নেওয়া হয়েছে:
আহকামে জিন্দেগী (মাকতাবাতুল আবরার প্রকাশনী)
মাওলানা মুহাম্মদ হেমায়েত উদ্দীন
শায়খুল হাদীছ, জামেয়া ইসলামিয়া আরার্বিয়া, তাঁতী বাজার, ঢাকা-১১০০
মুহাদ্দিছ, জামিয়া ইসলমিয়া দারুল উূলুম মাদানিয়া, ৩১২, দক্ষীণ যাত্রাবাড়ি, ঢাকা-১২৩৬

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Copyright Notice

কপি করা নিষিদ্ধ!