Skip to content

{ধারাবাহিক ভাবে বর্ণনা} ওযু কিভাবে করতে হয়? ওযু করার নিয়ম, ওযু করার সুন্নত তরিকা, ওযু করার নিয়ত, অযু/উজু/ওযুর আগে ও পরের দোয়া সমূহ

{ধারাবাহিক ভাবে বর্ণনা} ওযু কিভাবে করতে হয়? ওযু করার নিয়ম, ওযু করার সুন্নত তরিকা, ওযু করার নিয়ত, ওযুর আগে ও পরের দোয়া সমূহ

বিষয়: ওযু কিভাবে করতে হয়? ওযু করার নিয়ম, ওযু করার সুন্নত তরিকা, ওযু করার নিয়ত, অযু/উজু/ওযুর আগে ও পরের দোয়া সমূহ।

ওযুর ফরয, সুন্নাত, মোস্তাহাব ও আদব সমূহ {ওযুর মধ্যে যা যা করতে হয় তা ধারাবাহিক ভাবে বর্ণনা করা হলো, অযু/উজু/ওযু করার দোয়া সহ}

  • ওয়াক্ত আসার পূর্বেই উযুর সামান প্রস্তুত রাখা উত্তম। মাযূর না হলোে তার জন্য ওয়াক্ত আসার পূর্বে উযু করে নেয়া উত্তম। উযুর পূর্বে পেশাব পায়খানার হাজত থেকে ফারেগ হয়ে নেয়া উত্তম।
  • উঁচু স্থানে বসে উযু করা আদব।
  • পবিত্র স্থানে উযু করা।
  • কেবলামুখী হয়ে উযু করা আদব।
  • পানি ঢেলে নিতে হয়-এমন হলোে সে পানির পাত্রটি বাম দিকে রাখা আর পানি হাত দিয়ে তুলে নিতে হয়-এমন পাত্র হলোে সেটা ডান দিকে রাখা আদব।
  • প্রথমে উযুর নিয়ত করবে। নাপাকী দূর করার কিংবা পবিত্রতা অর্জন করার বা নামায জায়েয হওয়ার অথবা আল্লাহর নৈকট্য অর্জন করার নিয়ত করবে। নিয়ত করা সুন্নাত।
  • নিয়ত মুখেও উচ্চারণ করা মোস্তাহাব।
আরবীতে হওয়া জরুরী নয়। আপনি বাংলাতেও নিয়ত বা দোয়াগুলো পড়তে পারেন।
  • নিয়ত আরবীতে এভাবে করা যায়।

نويت أن أتوضا لرفع الحدث واستباحة للصلاة وتقربا إلى الله تعالى

অর্থ: আমি নাপাকী দূর করার, নামায বৈধ করার এবং আল্লাহর নৈকট্য লাভ করার নিয়তে উযু করছি।

  • নিয়ত করার পর এই দুআ পড়া মোস্তাহাব। এই দুআ পড়ে উযু শুরু করবে, তাহলোে ফেরেশতাগণ এই উযু ভাঙ্গার পূর্ব পর্যন্ত নেকী লিখতে থাকবে। দোয়াটি হলোো:

بسم الله والحمد لله

অর্থ: মহান আল্লাহ্র নামে আরম্ভ করছি এবং সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য তিনি আমাকে দ্বীন ইসলামের উপর রেখেছেন এজন্য।

  • কোন ওজর না থাকলে উযুর মধ্যে অঙ্গ মর্দন করে দেয়ার ক্ষেত্রে অন্যের সহযোগিতা গ্রহণ না করাই আদব। কোন ব্যক্তি স্বেচ্ছায় পানি তুলে দিলে বা পানি ঢেলে দিলেও কোন দোষ নেই।
  • তারপর হাতের কবজি ধোয়ার দুআ পড়বে। (মোস্তাহাব) উল্লেখ্য যে, উযুর অঙ্গগুলো ধোয়া বা মাসেহ করার যে সব দুআ বর্ণিত হয়েছে তা হাদীছ দ্বারা প্রমাণিত নয়। অতএব এগুলো পড়াকে সুন্নাত মনে করা যাবে না। তবে বুযুর্গানে দ্বীন এগুলো পাঠ করেছেন এবং করেন। তদুপরি এ দুআগুলোর অর্থ ভাল, এ হিসাবে এগুলো পাঠ করাকে মোস্তাহাব বা উত্তম বলা হয়।
  • বিসমিল্লাহ সহ হাতের কবজি ধোয়ার দুআটি এভাবে পড়া যায়:

بسم الله اللهم إني أسئلك اليمن والبركة وأعوذ بك من الشوم والهلكة

অর্থ: হে আল্লাহ! আমি তোমার নিকট মঙ্গল ও বরকত কামনা করি এবং অমঙ্গল ও ধ্বংস থেকে তোমার কাছে পানাহ চাই।

  • তারপর উভয় হাতের কবজি ধৌত করবে। তিনবার ধৌত করা সুন্নাত।
  • মেসওয়াক করা সুন্নাত। মেসওয়াক উযু শুরু করার পূর্বেও করা যায়। মেসওয়াক না থাকলে কিংবা মুখে ওজর থাকলে বা দাঁত না থাকলে আঙ্গুল দিয়ে হলোেও ঘষে নেয়া।
  • তারপর কুলি করার জন্য বিসমিল্লাহ সহ কুলি করার দুআ পড়বে। (মোস্তাহাব)
  • বিসমিল্লাহসহ দুআটি এভাবে পড়া যায়:

بسم الله اللهم اعني على تلاوة القران وذكرك وشكرك وحسن عبادتك

অর্থ: হে আল্লাহ, তুমি আমাকে সাহায্য কর যেন কুরআন তিলাওয়াত করতে, যিকির করতে ও শোকর আদায় করতে পারি।

  • দুআ পড়ার পর কুলি করবে। কুলি করা সুন্নাত এবং তিনবার কুলি করা সুন্নাত। তিনবারের জন্য স্বতন্ত্র ভাবে তিনবার পানি নেয়া উত্তম।
  • ডান হাতে কুলির পানি নিবে। (মোস্তাহাব)
  • রোযাদার না হলোে গড়গড়া করা সুন্নাত।
  • তারপর নাকে পানি দেয়ার জন্য বিসমিল্লাহ সহ নাকে পানি দেয়ার দুআ পড়বে। (মোস্তাহাব)
  • বিসমিল্লাহসহ দুআটি এভাবে পড়া যায়:

بسم الله اللهم أرحنى رائحة الجنة ولا ترحنى رائحة النار

অর্থ: হে আল্লাহ, তুমি আমাকে জান্নাতের সুগন্ধি দান কর এবং জাহান্নামের গন্ধ আমার ভাগ্যে দিও না।

  • নাকে পানি দেয়া সুন্নাত।
  • ডান হাত দিয়ে নাকে পানি দেয়া এবং বাম হাত দিয়ে ঝেড়ে ফেলা আদব।
  • রোযাদার না হলোে নাকের নরম স্থান পর্যন্ত পানি টেনে নেয়া উত্তম।
  • বাম হাতের কনিষ্ঠ আঙ্গুলের অগ্রভাগ দিয়ে নাকের মধ্যে পরিষ্কার করা আদব।
  • এরূপ তিনবার নাকে পানি দেয়া এবং ঝেড়ে ফেলা সুন্নাত। তিনবারের জন্য স্বতন্ত্র ভাবে তিনবার পানি নেয়া উত্তম।
  • তারপর বিসমিল্লাহ সহ মুখমন্ডল ধৌত করার দুআ পড়বে। (মোস্তাহাব)
  • বিসমিল্লাহসহ দুআটি এভাবে পড়া যায়:

بسم الله اللهم بيض وجهى يوم تبيض وجوه وتسود وجوه

অর্থ: হে আল্লাহ, যেদিন (কতক) মানুষের চেহারা উজ্জ্বল এবং (কতক) চেহারা দুঃখ মলিন হবে, সেদিন আমার চেহারাকে উজ্জ্বল করো।

  • মুখমন্ডল ধৌত করা ফরয ! কপালের উপরিভাগের চুলের গোড়া থেকে চিবুক (থুতনি) পর্যন্ত এবং দুই কানের লতি পর্যন্ত হলো মুখমন্ডলের সীমানা।
  • ডান হাতে পানি নিয়ে তার সাথে বাম হাত মিলিয়ে কপালের উপরিভাগ থেকে ধোয়া আরম্ভ করা আদব।
  • মুখে পানি আস্তে লাগাবে। জোরে পানি মারা মাকরূহ।
  • পাতলা দাড়ি হলোে চামড়াতে পানি পৌঁছাতে হবে। আর ঘন দাড়ি হলোে মুখের বেষ্টনীর ভিতরের দাড়ি ধৌত করতে হবে- চামড়াতে পানি পৌঁছানোর প্রয়োজন নেই। দাড়ির উপর থেকে নযর করলে যদি নীচের চামড়ার রং বুঝা যায় তাহলোে তা পাতলা দাড়ি বলে গণ্য হবে, অন্যথায় ঘন দাড়ি বলে গণ্য হবে।
  • চেহারার বেষ্টনীর বাইরের ঝুলন্ত দাড়িতে মাসেহ করা সুন্নাত।
  • এরূপ তিনবার মুখমন্ডল ধৌত করা সুন্নাত।
  • প্রতিবার পুরো মুখমন্ডলে ভাল করে হাত বুলাবে।
  • ঘন দাড়ি খেলাল করা সুন্নাত। তিনবার মুখ ধৌত করার পর দাড়ি খেলাল করতে হবে।
  • দাড়ি খেলাল করার তরীকা হলো এক কোষ পানি নিয়ে দাড়ির নীচের ভাগের থুতনিতে লাগাবে, তারপর খেলাল করবে। ডান হাতের তালু সামনের দিকে রেখে গলার দিক থেকে দাড়ির নীচ দিয়ে উপর দিকে খেলাল করা নিয়ম। খেলাল তিনবারের বেশী করবে না।

* তারপর বিসমিল্লাহ সহ ডান হাত ধোয়ার দুআ পড়বে। (মোস্তাহাব)

  • বিসমিল্লাহসহ দুআটি এভাবে পড়া যায়।

بسم الله اللهم أعطنى کتابي بيمينى وحاسبني حسابا يسيرا

অর্থ: হে আল্লাহ, আমার আমলনামা আমার ডান হাতে দিও এবং আমার হিসাব-নিকাশ সহজ করো।

  • ডান হাত কনুইসহ ধৌত করা ফরয। আঙ্গুলের অগ্রভাগ থেকে ধোয়া আরম্ভ করা সুন্নাত। এবং হাতের অগ্রভাগ নীচু করবে যাতে করে ধোয়া পানি আঙ্গুলের অগ্রভাগ দিয়ে গড়িয়ে পড়ে।
  • এভাবে তিনবার ধৌত করা সুন্নাত।
  • প্রতিবার ধৌত করার সময় পুরো অঙ্গ ভাল ভাবে মর্দন করবে।
  • হাতে আংটি থাকলে ভালভাবে নাড়াচাড়া করে ভিতরে পানি প্রবেশ করানো মোস্তাহাব। আর আংটি চাপা থাকলে অবশ্যই এরূপ করতে হবে মহিলাদের নাকের অলংকার, চুড়ি ইত্যাদির বেলায়ও এই নিয়ম প্রযোজ্য।
  • বাম হাত ধৌত করার মাসআলাও ডান হাতের ন্যায়। তবে বাম হাত ধৌত করার দুআটি (বিসমিল্লাহ সহ) এই:

بسم الله اللهم لا تعطنى کتابی بشمالي ولا من وراء ظهري

অর্থ: হে আল্লাহ, আমার আমলনামা দিওনা আমার বাম হাতে, আর না পেছন দিক থেকে।

  • বাম হাত তিনবার ধৌত করার পর উভয় হাতের আঙ্গুল খেলাল করবে ! এটা সুন্নাত।
  • আঙ্গুল খেলাল করার তরীকা হলোঃ এক হাতের আঙ্গুলগুলো অন্য হাতের আঙ্গুল সমূহের মধ্যে প্রবেশ করানো কিংবা বাম হাতের আঙ্গুলগুলো এক সাথে ডান হাতের পিঠের দিক থেকে ডান হাতের আঙ্গুলগুলোতে প্রবেশ করানো। এমনিভাবে ডান হাতের আঙ্গুলগুলো দিয়ে বাম হাতের আঙ্গুল খেলাল করা।
  • তারপর বিসমিল্লাহ সহ মাথা মাসেহ করার দুআ পড়বে। (মোস্তাহাব)

এখানে কনুইর দিক থেকে ধোয়া আরম্ভ করার একটি মতও রয়েছে যেন আঙ্গুলের অগ্রভাগ দিয়ে পানি গড়াতে পারে। তবে উপরোক্ত তরীকায় হাত ধোয়া হলোে উভয় মতের উপর আমল হয়ে যায়।

  • বিসমিল্লাহসহ দুআটি এভাবে পড়া যায়।

بسم الله اللهم أظلني تحت ظل عرشك يوم لا ظل إلا ظل عرشك

অর্থ: হে আল্লাহ, যেদিন তোমার আরশের ছায়া ছাড়া আর অন্য কোন ছায়া থাকবে না, সেদিন তোমার আরশের ছায়াতলে আমাকে স্থান দিও।

  • মাথা মাসেহের জন্য নতুন পানি নেয়া সুন্নাত।
  • মাথা মাসেহ করা। পুরো মাথায় মাসেহ করা সুন্নাত। অন্ততঃ মাথার চার ভাগের একভাগ মাসেহ করা ফরয।
  • মাথায় মাসেহ করার তরীকা হলোঃ দুই হাতের পুরো তালু আঙ্গুলের পেট সহ মাথার অগ্রভাগে রেখে পুরো মাথা জুড়ে পেছনের দিকে টেনে আনা। মাথার অগ্রভাগ থেকে মাসেহ শুরু করা সুন্নাত।
  • উভয় হাত দ্বারা মাথা মাসেহ করা সুন্নাত। এক হাত দ্বারা মাসেহ করা সুন্নাতের খেলাফ।
  • তারপর বিসমিল্লাহ সহ কান মাসেহের দুআ পড়বে। (মোস্তাহাব)
  • বিসমিল্লাহসহ দুআটি এভাবে পড়া যায়:

بسم الله اللهم اجعلني من الذين يستمعون القول فيتبعون أحسنه

অর্থ: হে আল্লাহ, যারা (তোমার) কথা শুনে মেনে চলে আমাকে তাদের অন্তর্ভুক্ত কর।

  • কান মাসেহ করা (উভয় কান এক সাথে) সুন্নাত।
  • কান মাসেহ করার তরীকা হলোঃ উভয় হাতের কনিষ্ঠা আঙ্গুলের অগ্রভাগ কানের ছিদ্রে প্রবেশ করিয়ে একটু নাড়াচাড়া দেয়া নিয়ম।
  • তারপর তর্জনী (শাহাদাত আঙ্গুল) এর অগ্রভাগ দ্বারা কানের ভিতরের দিক মাসেহ করবে। অতপর বৃদ্ধ আঙ্গুলের পেট দ্বারা কানের পেছনের ভাগ মাসেহ করবে।
  • কান মাসেহের জন্য নতুন পানি নেয়া সুন্নাত।
  • তারপর বিসমিল্লাহ সহ গর্দান মাসেহের দুআ পড়বে। (মোস্তাহাব)

(মাসেহ করার এই তরীকাটি সহজ। অন্য একটি তরীকাও বর্ণিত আছে, তা হলো- উভয় হাতের তিন আঙ্গুলের পেট (শাহাদাত ও বৃদ্ধা আঙ্গুল ব্যতীত) মাথার অগ্রভাগের উপরে রেখে পেছন দিকে টেনে নিয়ে যাবে। তারপর দুই হাতের তালু মাথার দুই পার্শ্বে রেখে পেছন দিক থেকে সামনে টেনে নিয়ে আসবে।)

  • বিসমিল্লাহসহ দুআটি এভাবে পড়া যায়:

بسم الله اللهم اعتق رقبتي من النّار

অর্থ: হে আল্লাহ, আমার ঘাড়কে জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা কর।

  • অতঃপর গর্দান মাসেহ করবে। (মোস্তাহাব)
  • উভয় হাতের তিন আঙ্গুলের পিঠ দ্বারা গর্দান মাসেহ করবে।
  • তারপর বিসমিল্লাহ সহ ডান ধোয়ার দুআ পড়বে। (মোস্তাহাব)
  • বিসমিল্লাহসহ দুআটি এভাবে পড়া যায়:

بسم الله اللهم ثبت قدمى على الصراط يوم تزل الاقدام

অর্থ: হে আল্লাহ, যেদিন অনেক পা পুলসিরাত থেকে পিছলে যাবে সেদিন আমার পদযুগল স্থির রেখ।

  • প্রথমে ডান পা ধৌত করবে। পা ধৈাত করা ফরয।
  • পায়ের অগ্রভাগে পানি ঢালা সুন্নাত।
  • বাম হাত দিয়ে পা বিশেষভাবে পায়ের তলা মর্দন করা আদব।
  • তিনবার ধৌত করা সুন্নাত।
  • প্রতিবার পুরো অঙ্গ ভাল করে মর্দন করবে।
  • ডান পা ধৈাত করার পর ডান পায়ের আঙ্গুল খেলাল করবে। (সুন্নাত)
  • খেলাল করার তরীকা হলোঃ বাম হাতের কনিষ্ঠা আঙ্গুল দ্বারা খেলাল করা আদব।
  • ডান পায়ের কনিষ্ঠা আঙ্গুল থেকে খেলাল আরম্ভ করা নিয়ম।
  • খেলাল করার সময় পায়ের আঙ্গুলের নীচের দিক থেকে আঙ্গুল প্রবেশ করিয়ে খেলাল করবে।
  • তারপর বিসমিল্লাহ সহ বাম পা ধোয়ার দুআ পড়বে। (মোস্তাহাব)
  • বিসমিল্লাহসহ দুআটি এভাবে পড়া যায়:

بسم الله اللهم اجعل ذنبى مغفورا وسعي مشكورا وتجارتي لن تبور

অর্থ: হে আল্লাহ, আমার গোনাহ মার্জনা কর, আমার চেষ্টাকে সাফল্য মন্ডিত কর এবং আমার (আখেরাতের) ব্যবসাকে ক্ষতি থেকে রক্ষা কর।

  • তারপর ডান পায়ের ক্ষেত্রে বর্ণিত নিয়ম অনুযায়ী বাম পা ধৌত করবে। শুধু বাম পায়ের আঙ্গুল খেলাল করার সময় বৃদ্ধ আঙ্গুল থেকে কনিষ্ঠ আঙ্গুলের দিক খেলাল করা নিয়ম।

উযুর সব অঙ্গের জন্য প্রযোজ্য মাসায়েল

  • উযুর অঙ্গগুলো ধোয়ার সময় জোড়া ও ভাজগুলোতে বিশেষ যত্ন সহকারে পানি পৌঁছাতে হবে।
  • উযুর মাঝে মাঝে নিম্নোক্ত দুআ পড়া উত্তম-

اللهم اغفر لي ذنبي ووسع لي في داري وبارك لي في رزقي

অর্থঃ হে আল্লাহ, আমার পাপ ক্ষমা কর, আমার ঘরে প্রাচুর্য্য দান কর এবং আমার রিযিকে বরকত দাও।

  • উযুর প্রয়োজন মোতাবেক পানি ব্যবহার করবে-কম বা বেশী করবে না। আজকাল টেপে উযু করতে গেলে প্রচুর পানির অপচয় হয়। তাই সম্ভব হলোে কোন পাত্রে পানি নিয়ে উযু করবে। অন্যথায় টেপের পানি হালকা ভাবে ছেড়ে উযু করবে এবং প্রয়োজনে মাঝে মধ্যে বন্ধ করে নিবে।
  • উযুর মধ্যে কোন জাগতিক কথা-বার্তা না বলা আদব।
  • প্রত্যেক অঙ্গকে ফরয পরিমাণের চেয়ে কিছু বেশী ধৌত করা উত্তম। কেননা, কিয়ামতের দিন উযুর অঙ্গগুলো উজ্জ্বল হবে।
  • উযুর প্রত্যেকটা অঙ্গের শুরুতে কালেমায়ে শাহাদাত এবং শেষে দুরূদ শরীফ পড়াকে ফোকাহায়ে কেরাম মোস্তাহাব বলেছেন। কারও কারও মতে অন্ততঃ যে কোন একটি অঙ্গের ক্ষেত্রে আমলটি করে নিলেও চলবে।

অযু করার পর দোয়া/ওযুর পরের দোয়া

  • রোযাদার না হলোে উযুর অবশিষ্ট পানি বা তার কিয়দাংশ পান করা মোস্তাহাব। এ পানি পান করা অনেক রোগের শেফা। এ পানি কেবলামুখী হয়ে পান করা উত্তম। দাঁড়িয়ে এবং বসে উভয়ভাবে পান করা যায়। এ পানি পান করার দুআ হলোো:

اللهم اشفني بشفائك وداوني بدوائك واعصمني من الوهن والأمراض والأوجاع

অর্থ: হে আল্লাহ, আমাকে শেফা দান কর তোমার শেফা দ্বারা, আমার চিকিৎসা করাও তোমার দাওয়াই দ্বারা এবং আমাকে রক্ষা কর দুর্বলতা, রোগ-ব্যাধি ও ব্যথা-বেদনা থেকে।

  • উযুর শেষে কালিমায়ে শাহাদাত পড়া মোস্তাহাব এবং এটা দাঁড়িয়ে কেবলামুখী হয়ে, ওযু করে আকাশের দিকে তাকিয়ে পড়া মোস্তাহাব।
  • তারপর নিম্নোক্ত দুআটি পড়া মোস্তাহাব (দাঁড়িয়ে, কেবলামুখী হয়ে এবং আকাশের দিকে নজর করে)।

اللهم اجعلني من التوابين واجعلني من المتطهرين واجعلني من عبادك الصالحين واجعلني من الذين لا خوف عليهم ولا هم يحزنون

অর্থঃ হে আল্লাহ! আমাকে তওবাকারীদের অন্তর্ভুক্ত কর, পবিত্রতা অর্জনকারীদের অন্তর্ভুক্ত কর, তোমার নেক বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত কর এবং ঐসব লোকদের অন্তর্ভুক্ত কর যাদের থাকবেনা কোন ভয় এবং যারা হবেনা দুঃখীত।

  • নিম্নোক্ত দুআটি পড়াও উত্তম (দাঁড়িয়ে কেবলামুখী হয়ে এবং ওযু করে আকাশের দিকে তাকিয়ে)।

سبحانك اللهم وبحمدك أشهد أن لا إله إلا أنت أستغفرك واتوب اليك

অর্থঃ হে আল্লাহ! তোমার স্বপ্রশংস পবিত্রতা বর্ণনা করছি। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, তুমি ব্যতীত কোন মা’বূদ (ইবাদতের যোগ্য) নেই। তোমার নিকট আমি ক্ষমা প্রার্থনা করছি এবং তোমর সামনে তওবা করছি।

  • সূরা কদর পড়াও উত্তম। উযুর পর যে সূরা ক্বদর একবার পড়বে সে সিদ্দীকিনদের অন্তর্ভুক্ত হবে। দুইবার পড়লে তাকে শহীদদের তালিকাভুক্ত করা হবে। আর তিনবার পড়লে নবীদের সঙ্গে তার হাশর হবে।
  • (উযুর পর রুমাল, তোয়ালিয়া, গামছা ইত্যাদি দ্বারা উযুর পানি অঙ্গ থেকে মুছে নেয়ায় ক্ষতি নেই। তবে খুব মর্দন করে নয় বরং উত্তম হলো হালকাভাবে মুছে নেয়া।
  • উযুর পর মাকরূহ ওয়াক্ত না হলোে দুই রাকআত তাহিয়্যাতুল উযু নামায পড়ে নেয়া উত্তম।

যে সব কারণে উযু মাকরূহ হয় {উযু ভঙ্গ হয় না তবে ছওয়াব কমে যায়}

উযুর মধ্যে নিম্নলিখিত কার্যগুলো করলে উযু মাকরূহ হয়ে যায় অর্থাৎ, করলে উযু ভঙ্গ হয় না তবে ছওয়াব কমে যায়।

১. তারতীব অনুযায়ী উযু না করলে।

২. অপবিত্র স্থানে বসে উযু করলে।

৩. অতিরিক্ত পানি ব্যয় করলে।

৪. উযুতে রত থাকা অবস্থায় জাগতিক কথা-বার্তা বললে। তবে কোন বিশেষ প্রয়োজনে দু একটি কথা বললে কোন আপত্তি নেই।

৫. মুখ অথবা অন্য কোন অঙ্গে জোরে পানি মারলে।

৬. মুখে পানি দেয়ার সময় সুরসুর শব্দ বেরিয়ে আসলে।

৭. তিনবারের অধিক কোন অঙ্গ ধৌত করলে কিংবা অঙ্গগুলো একবার ধুয়ে মুছে ফেললে। তবে কোন কারণবশতঃ এরূপ করলে কোন দোষ নেই। বিনা কারণে করা ঠিক নয়।

৮. ডান হাতে নাক পরিষ্কার করলে।

৯. প্রথমে বাম হাত অথবা বাম পা ধৌত করলে।

যে সব কারণে উযু ভাঙ্গ হয় না

কোন কোন কারণে উযু ভঙ্গ হয় না, তবে সাধারণতঃ উযু ভঙ্গ হয় বলে খ্যাত। যেমনঃ

১. বসে বসে তন্দ্রাচ্ছন্ন হলোে উযু ভঙ্গ হয় না।

২. নামাযের সাজদায় তন্দ্রাভূত হয়ে পড়লে উযু ভঙ্গ হয় না। তবে তন্দ্রায় শরীরের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ শিথিল হয়ে এক অঙ্গ অন্য অঙ্গের সাথে মিশে গেলে, যেমন কনুই উরুর সাথে মিশে গেলে অথবা উরু পেটের সাথে মিললে উযু ভঙ্গ হয়ে যায়। তবে মেয়েলোক এর ব্যতিক্রম।

৩. নামাযের মধ্যে মুচকি হাসি দিলে উযু ভঙ্গ হয় না।

৪. উযু করার পর স্ত্রীলোক তার সন্তানকে দুধ পান করালে অথবা স্তন থেকে দুধ নিংড়িয়ে ফেললেও উযু ভঙ্গ হয় না।

৫. নিজের অথবা স্ত্রীলোকের যৌনাঙ্গে দৃষ্টিপাত করলে উযু ভঙ্গ হয় না। তবে ইচ্ছাকৃত এরূপ করা ভাল নয়।

৬. পুরুষ এবং স্ত্রীলোকের শরীর স্পর্শ করলে অথবা চুম্বন করলে উযু ভঙ্গ হয়না।

৭. উযু করার পর লজ্জা স্থানে হাত লাগালে উযু নষ্ট হবে না। তবে ইচ্ছাকৃতভাবে এরূপ করা মাকরূহ।

৮. উযু করার পর নখ কাটলে অথবা পায়ের চামড়া কাটলে অথবা উপড়ালে উযু ভঙ্গ হয় না।

৯. বিড়ি সিগারেট সেবন করলে উযু ভঙ্গ হয় না।

১০. সতর খুললে উযু ভঙ্গ হয় না।

১১. কারও সতর দেখলে উযু ভঙ্গ হয় না।

১২. মহিলাদের সামনের রাস্তা দিয়ে বাতাস বের হলোে (যেমন রোগের কারণে এমন হয়ে থাকে, এতে) উযু ভঙ্গ হয়না।

ওযু ভঙ্গের কারণ, কি কি কারনে অযু ভঙ্গ হয়?

১. প্রস্রাব, পায়খানা করা।

২. পিছনের রাস্তা দিয়ে বাতাস বেরিয়ে আসা।

৩. প্রস্রাব পায়খানা ব্যতীত অন্য কোন বস্তু যেমন কেঁচো, ক্রিমি, পাথরকণা ইত্যাদি অথবা এগুলো ছাড়াও যদি অন্য কোন বস্তু পেশাব অথবা পায়খানার রাস্তা দিয়ে নির্গত হয়, তখন উযু ভঙ্গ হয়ে যাবে।

৪. শরীরের অন্য কোন স্থান থেকে রক্ত, পূঁজ ইত্যাদি বেরিয়ে গড়িয়ে গেলে।

৫. বমি ছাড়াও রক্ত, পিত্ত, খাদ্য অথবা পানি মুখ ভরে নির্গত হলোে উযু ভঙ্গ হবে। এসমস্ত বস্তু অল্প অল্প করে কয়েক বার নির্গত হলোেও উযু ভঙ্গ হবে যদি সব বারেরটা একত্রে হলোে মুখ ভরা পরিমাণ হত বলে মনে হয়।

৬. থুথুতে রক্তের পরিমাণ বেশী হলোে কিংবা উযু করার সময় দাঁতের মাড়ি থেকে রক্ত বেরিয়ে আসলে উযু ভঙ্গ হবে। রক্তের পরিমাণ অল্প হলোে কোন ক্ষতি নেই তবে রক্ত অধিক পরিমাণে হলোে অর্থাৎ, থুথু থেকে রক্তের পরিমাণ বেশী হলোে রক্ত বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত উযু করতে পারবে না।

৭. বীর্য, মযী অথবা হায়েযের রক্ত দেখা দিলে উযু ভঙ্গ হয়ে যাবে। এর বর্ণনা গোসল এর আলোচনায় করা হবে। উল্লেখ্য যে, বীর্য ও মযীতে পার্থক্য আছে। যথা:

বীর্য/মনি কাকে বলে?

যৌন সম্ভোগের সময় তৃপ্তি হওয়ার প্রাক্কালে অথবা ঘুমন্ত অবস্থায় স্বপ্নদোষ হলোে যা নির্গত হয় তা হলোো বীর্য। বীর্য বের হলোে গোসল করা আবশ্যক হয়।

মযী কাকে বলে?

আর পুংলিঙ্গের চটপটে ভাব দ্বারা অথবা স্ত্রীলোককে চুম্বন করায় অথবা স্ত্রীলোকের নিকটবর্তী হওয়ায় অথবা কোন খারাপ ধারণার বশবর্তী হলোে লিঙ্গের অগ্রভাগ দিয়ে পানির মত যে বস্তু বেরিয়ে আসে, তা হলো মযী। কিন্তু মযী বের হলোে গোসল করা আবশ্যক হয় না তবে উযু ভেঙ্গে যায়।

৮. স্ত্রীলোকের স্তন থেকে বুকের দুধ ব্যতীত অন্য বস্তু বেরিয়ে আসলে এবং ব্যথা হলোে উযু ভঙ্গ হবে।

৯. যোনির মধ্যে আঙ্গুল প্রবেশ করালে উযু ভঙ্গ হয়ে যায়।

১০.বেহুঁশ বা পাগল হলোে উযু ভঙ্গ হয়ে যায়।

১১. নামাযের মধ্যে এরকম শব্দ সহকারে হাসা যে, পার্শ্বের লোক সে শব্দ শুনতে পায় এর দ্বারা উযু ভঙ্গ হয়ে যায়।

মাযূর ব্যক্তির ওযু করার নিয়ম

মায়ূর কে?

যার নাক বা অন্য কোন যখম থেকে অনবরত রক্ত বইতে থাকে বা অনর্গল পেশাবের ফোঁটা আসতে থাকে, এমনকি নামাযের সম্পূর্ণ ওয়াক্তের মধ্যে এতটুকু সময়ও বিরতি হয় না, যার মধ্যে সে শুধু উযুর ফরয অঙ্গগুলো ধুয়ে সংক্ষেপে ফরয নামায আদায় করতে পারে, এরূপ ব্যক্তিকে মাযূর বলে।

মাযূর ব্যক্তির অযু করার পদ্ধতি:

  • মাযূর ব্যক্তিকে প্রত্যেক নামাযের ওয়াক্তে নতুন উযু করতে হবে। যে পর্যন্ত ঐ ওয়াক্ত থাকবে সে পর্যন্ত তার উযু থাকবে অর্থাৎ, ঐ ওজরের কারণে উযু যাবে না। তবে ঐ কারণ ছাড়া উযু ভঙ্গের অন্য কোন কারণ ঘটলে উযু ভঙ্গ হয়ে যাবে।
  • মাযূর ব্যক্তি যে কারণে মাযূর হয়েছে সে কারণ বন্ধ থাকার সময় উযু ভঙ্গের অন্য কোন কারণ ঘটায় যদি উযু করে, তারপর মাযূর যে কারণে হয়েছে সে কারণ ঘটে, তাহলোেও উযু চলে যাবে অবশ্য মাযূর যে কারণে হয়েছে সে কারণে যে উযু করবে সেই উযু ওয়াক্তের শেষ পর্যন্ত থাকবে যদি উযু ভঙ্গের অন্য কোন কারণ না পাওয়া যায়।
  • যদি এই রক্ত ইত্যাদি (অর্থাৎ, যে কারণে মাযূর হয়েছে) কাপড়ে লাগে এবং এরূপ মনে হয় যে, নামায শেষ হওয়ার পূর্বে আবার লেগে যাবে, তাহলোে ঐ রক্ত ধোয়া ওয়াজিব নয়। অন্যথায় ধুয়ে নিয়ে পাক কাপড়েই নামায পড়তে হবে। তবে রক্ত এক দেরহাম পরিমাণের কম হলোে তা না ধুয়েও নামায হয়ে যাবে। হাতের তালু সম্পূর্ণ খুলে তাতে পানি রাখলে যে পরিমাণ স্থানে পানি থাকে তাকে এক দেরহাম-এর পরিমাণ বলা হয়। (বেহশতি জেওর)
  • মাযূর বলে গণ্য হওয়ার জন্য শর্ত হলো পূর্ণ এক ওয়াক্ত (শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত) এমন অতিবাহিত হওয়া, যার মধ্যে সে ওজর থেকে এতটুকু বিরতি পায় না যাতে উযুর ফরযগুলো আদায় করে ফরয নামায পড়ে নিতে পারে। এরপর প্রতি ওয়াক্তে সারাক্ষণ সেই ওজর থাকা জরুরী নয় বরং ওয়াক্তের মধ্যে এক বারও যদি পাওয়া যায় তবুও সে মাযূর বলে গণ্য থাকবে।
  • অবশ্য যদি এমন একটা ওয়াক্ত অতিবাহিত হয়, যার মধ্যে একবারও সে ওজর দেখা যায়নি, তাহলোে সে আর মাযূর থাকল না।

সমাপ্ত: পোষ্টটি থেকে যা জানলাম- ওযু কিভাবে করতে হয়? ওযু করার নিয়ম, ওযু করার সুন্নত তরিকা, ওযু করার নিয়ত, ওযুর আগে ও পরের দোয়া সমূহ।

পোষ্টটি লিখতে নিম্নক্তো বই/লেখকের লিখনী থেকে সাহায্য নেওয়া হয়েছে:
আহকামে জিন্দেগী (মাকতাবাতুল আবরার প্রকাশনী)
মাওলানা মুহাম্মদ হেমায়েত উদ্দীন
শায়খুল হাদীছ, জামেয়া ইসলামিয়া আরার্বিয়া, তাঁতী বাজার, ঢাকা-১১০০
মুহাদ্দিছ, জামিয়া ইসলমিয়া দারুল উূলুম মাদানিয়া, ৩১২, দক্ষীণ যাত্রাবাড়ি, ঢাকা-১২৩৬

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Copyright Notice

কপি করা নিষিদ্ধ!